সংকটকালে রাজনীতি নাস্তি, থাকুক পরিচ্ছন্ন টিকানীতি https://ift.tt/3vSsVd9 - MAS News bengali

সংকটকালে রাজনীতি নাস্তি, থাকুক পরিচ্ছন্ন টিকানীতি https://ift.tt/3vSsVd9

প্রশান্ত ভট্টাচার্য অতিমারি বলি বা মহামারী, এর সঙ্গে একটা রাজনীতি আছে। যতই মুখে বলা হোক না কেন এমন বিপদের সময় রাজনীতি করতে নেই, তবু রাজনীতিই করা হয়। এই করোনা রাজনীতির কেন্দ্রে আছে টিকা আর তার বাজারজাতকরণ নিয়ে ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা। এবং ভ্যাকসিন উৎপাদক দেশগুলির শাসকদের সঙ্গে বোঝাপড়া। টিকা আছে। টিকা আবার নেই-ও। এই হল টিকা রাজনীতি। আর আমাদের দেশ যেমন সব ব্যাপারেই রাজনীতিতে পারঙ্গম, তেমন টিকা-রাজনীতিও আমাদের দেশে চড়া দাগের হচ্ছে। এমনকী, দেশের শীর্ষ আদালতও বুঝতে চাইছে সরকার টিকা নিয়ে ঠিক কী করতে চাইছে। করোনাযুদ্ধে টিকানীতির পুনর্বিবেচনা করতে মোদী সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের কাছে গোটা ব্যাপারটি দৃশ্যত ‘খামখেয়ালি’ ও ‘অযৌক্তিকতা’য় ভরা বলে মনে করা হয়েছে। বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি এল এন রাও ও বিচারপতি এস রবীন্দ্র ভাটের বেঞ্চের মন্তব্য, ‘১৮-৪৪ বছর বয়েসিদের দাম দিয়ে টিকা নেওয়ার কথা বলেছে কেন্দ্র। ৪৫ ঊর্ধ্বদের টিকা দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল ১৮-৪৪ বছর বয়েসিদেরও করোনা আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। এমনকী, কিছু কিছু ক্ষেত্রে করোনায় মারাও যাচ্ছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে ১৮-৪৪ বছরের জন্য দাম দিয়ে কেন্দ্রের টিকাকরণের নীতি দৃশ্যতই অযৌক্তিক ও খামখেয়ালি মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছে।’ এমনকী, শীর্ষ আদালত কেন্দ্রের টিকাকরণ নীতি নিয়েই একাধিক প্রশ্ন তুলেছে। সরকার বলছে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ১০৮ কোটি দেশবাসীর টিকা দেওয়া হয়ে যাবে। সুপ্রিম কোর্টও কেন্দ্রের এই নিছক ভাষণে তৃপ্ত নয়। উলটে বেঞ্চ জানতে চেয়েছে, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কত পরিমাণ টিকা দেশে পাওয়া যাবে তার রেকর্ড দেখাক সরকার। যার ভিত্তিতে বোঝা যাবে, বিভিন্ন রাজ্যে টিকার ঘাটতি কত। গ্রামে টিকা না পাওয়ার সমস্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। ওই তিন বিচারপতির বেঞ্চ জানতে চেয়েছে, ‘এই পরিস্থিতিতে কীভাবে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের মানুষের টিকাকরণের কথা ভাবছে কেন্দ্র, তার একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আনা হোক।’ সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ যখন এই রকম, তখনই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বর বেজে উঠল ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কের গলায়। নরেন্দ্র মোদীর গুডবুকে থাকা মুখ্যমন্ত্রী নবীন কেন্দ্রের কাছে টিকানীতি বদলানোর জন্য আবেদন জানিয়েছেন। তবে সেখানেই থেমে থাকেননি উৎকলমণি। এর পাশাপাশি দেশের সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকেও চিঠি দিয়ে একসঙ্গে জোট বেঁধে কাজ করার ডাক দিয়েছেন। মোদী সরকারের সঙ্গে সার্বিক ভাবে সুসম্পর্ক বজায় রাখা নবীন পট্টনায়কের এই চিঠি জাতীয় রাজনীতিতে নতুন চাঞ্চল্য ফেলে দিয়েছে। উপরন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরও বেশ কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এই বিষয়ে ফোনেও কথা বলেছেন নবীন। মমতার মতো নবীনেরও বক্তব্য, গোটা দেশে টিকা বণ্টনে সুষম নীতি গ্রহণ করা হোক এবং কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই উদ্যোগী হয়ে টিকা জোগাড় করুক। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের কাছে নবীন লিখেছেন, 'অতিমারির পরবর্তী ঢেউ থেকে বাঁচতে একমাত্র উপায় টিকাকরণ। প্রত্যেক রাজ্যকেই এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। টিকা সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে কোনও রাজ্যই যেন অন্য রাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না নেমে পড়ে।' নবীনের এই চিঠির আগে আর এক অ-বিজেপি শাসিত রাজ্য কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারই বিজয়ন বাংলা, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, তামিলনাডু, তেলাঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, পঞ্জাব ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি লেখেন। বিজয়ন সেই চিঠি উল্লেখ করে টুইট করেন, 'যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো আদর্শ মেনে ১১ জন মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিলাম। দুভার্গ্যজনক, বিনামূল্যে টিকাকরণ ও টিকা কেনার দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলেছে কেন্দ্র। তারা যাতে ব্যবস্থা নিতে পদক্ষেপ করে, সে জন্য একজোট হয়ে দাবি করতে হবে।' নবীন পরিসরটা আরও বাড়িয়ে সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রের টিকানীতির বিরুদ্ধে জোট বাঁধতে আহ্বান জানালেন। তিনি চেয়েছেন টিকানীতির বিকেন্দ্রীকরণ। দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্র যেন টিকা নিয়ে রাজ্যগুলিকে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তৃতীয় দফায় টিকানীতি বদলে কেন্দ্র সব প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাকরণে ছাড়পত্র দিয়েছে। ভাল কথা। কিন্তু এই নয়া ফরমানে কেন্দ্র জানিয়েছে, সব রাজ্যই নিজেদের প্রয়োজনে সরাসরি প্রস্তুতকারী সংস্থার থেকে টিকা কিনতে পারবে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেশজুড়ে টিকার চাহিদা হুড়মুড়িয়ে বাড়ছে। চাহিদা ও জোগানে সামঞ্জস্য না থাকায় জনমানসে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। নিজ নাগরিকদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষার খাতিরে রাজ্যগুলিও মরিয়া হয়ে বিদেশ থেকে টিকা আমদানির বিষয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছে। কিন্তু রাজ্য যদি সরাসরি বিদেশ থেকে টিকা আমদানি করতে চায়, তবে সেই আমদানির ছাড়পত্র দেবে কেন্দ্রই। সেই জটিলতার কারণেই বিদেশি ফার্মা কোম্পানিগুলি রাজ্যের সঙ্গে টিকা সংক্রান্ত চুক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আর দেশীয় সংস্থার পক্ষেও এই বিপুল চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিধানসভা ভোটের প্রচারের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভ্যাকসিন নিয়ে বার বার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। সমস্ত দেশবাসীকে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার জোরালো দাবি করেছেন। আমরা অনেকেই তখন মনে করেছি, এসবই নির্বাচনী প্রচারের অঙ্গ। ভোটার টানার রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। কিন্তু এখন ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারই বিজয়ন, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়করা সবাই একই কথা বলছেন। নবীন তাঁর চিঠিতে দাবি করেছেন, দেশজুড়ে টিকার জোগান নিশ্চিত করুক কেন্দ্রই। মোদ্দা কথা হল, তিনি মনে করেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদেশ থেকে টিকা আমদানি করে সব রাজ্যকে প্রয়োজন মতো সরবরাহের দায়িত্ব কেন্দ্রের নেওয়া উচিত। বিজয়নও দাবি করেছেন, জনস্বার্থে টিকা বিনামূল্যে দেওয়া উচিত। রাজ্যের ওপরে টিকা কেনার বোঝা চাপানো চলবে না। এর আগেই মমতা বলেছিলেন, '৩০ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রের কাছে কোনও ব্যাপার নয়। এই টাকায় দেশের ১৪০ কোটি মানুষকে ফ্রি ভ্যাকসিন দেওয়া যেতে পারে।' করোনাযুদ্ধের মধ্যে রাজ্যগুলিকে টিকাযুদ্ধে নামিয়ে দিতে চাইছে কেন্দ্র। এটা কোনও টিকানীতি নয়, টিকা-রাজনীতি। এটা না বললে সত্যের অপলাপ হবে যে স্বাধীনোত্তরকালে এত বড় সংকটের মুখোমুখি পড়েনি আমাদের রাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বা অন্য সব বিভেদকে দূরে সরিয়ে রেখে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্বার্থে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির একযোগে কাজ করাই কাঙ্ক্ষিত রাজনীতি। দুর্ভাগ্য আমাদের যে, এই সংকটেও কোনও রাজ্যের মুখ্যসচিবকে সংকীর্ণ জননীতির স্বার্থে শোকজ করা হয়, রাজ্যপাল টুইটার হ্যন্ডেলে মুখ্যমন্ত্রীকে বেঁধেন। সবই করার ফুরসত পাওয়া যাবে যদি টিকার বন্ধনে বেঁধে করোনার পরবর্তী ঢেউ থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করা যায়। আর তবেই আসবে 'আচ্ছে দিন'। ( এই প্রবন্ধে প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণ ভাবে লেখকের ব্যক্তিগত। এই সময় ডিজিটাল কোনও ভাবেই তার দায়ভার বহন করে না।)


from Bangla News: বেঙ্গলি খবর, Latest News in Bengali, Breaking News In Bengali, সর্বশেষ সংবাদ | Eisamay https://ift.tt/3wV9O2c
Previous article
Next article

Leave Comments

Post a Comment

ads

Articles Ads 1

ads

Advertisement Ads