অসাম্য রুখতে বাজেটে কী দাওয়াই নির্মলার? https://ift.tt/GQ17ESMed - MAS News bengali

অসাম্য রুখতে বাজেটে কী দাওয়াই নির্মলার? https://ift.tt/GQ17ESMed

লেখনী: বিশ্বজিৎ মন্ডল এবং শাশ্বতী দে এই সময় ডিজিটাল ডেস্ক : শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আয়। সব ক্ষেত্রেই গরিব-ধনীর ফারাক বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য এক অশনি সংকেত। গত দু'বছরে ক্রমশ তীব্রতা বাড়িয়ে পৃথিবীর নানা দেশে, নানা প্রান্তে নানা রূপে হামলা চালিয়েছে করোনার নানা ভ্যারিয়েন্ট। এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন হল ওমিক্রন। তাই প্রথমে ছোট গল্পের আকারে থাকলেও, পরে প্রবন্ধ, এবং এখন তো প্রায় উপন্যাসের মতো পরিধি বিস্তার করে ঘরে ঘরে হানা দিচ্ছে ওমিক্রন। স্বভাবতই, পরিধি যত বাড়বে, স্বাস্থ্য ছাড়াও করোনার আর্থ-সামাজিক প্রভাবের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠবে। মোটামুটি পরিষ্কার যে তৃতীয় ঢেউয়ের ছোঁয়া হয়তো অসংখ্য মানুষকে পেতে হবে। তাতে ভালো হবে কি মন্দ হবে, তার উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভে। আপাতত আশা-আশঙ্কার আসা-যাওয়াতেই থাকা। তবে এটা নিশ্চিত যে কোভিড-উত্তর পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে উত্তরণের পথ যথেষ্ট দুর্গম। অতএব নজরে থাকবে আজকের কেন্দ্রীয় বাজেট। অনেকের হয়তো স্মরণে আছে যে, আমাদের দেশে সরকারি স্তরে আর্থিক পুনরুজ্জীবনের জন্যে বেশ কয়েকটি আর্থিক সাহায্যের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তাতে স্বল্পকালে অনেকে বেশ উপকৃতও হয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত নিরাময়ের রাস্তা এখনও অধরা। মোটের উপর ২০২২ সালের শুরুতে এসে এ কথা সহজবোধ্য যে করোনার কষাঘাত শুধু বিশ্ববাসীর শারীরিক স্বাস্থ্য বেহাল করেনি, বিশ্ব-অর্থনীতিও নানা ভাবে পর্যুদস্ত। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের অভিঘাত থেকে কোন দেশ, কবে এবং কী ভাবে বেরোবে তা বলা প্রায় অন্ধকারে চাল থেকে কাঁকর বাছার সামিল। তবু এটা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে কোভিডের কারণে গোটা পৃথিবীতে আয়ের বণ্টন ভীষণ ভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যেহেতু আর্থিক ভাবে সমাজের নিচুতলার মানুষজন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে গত দু'বছরের আংশিক বা পূর্ণ লকডাউনের কারণে, আয় বণ্টনের বৈষম্য বাড়াটাই স্বাভাবিক। ভারত কোনও ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত অক্সফ্যাম রিপোর্ট, ওয়ার্ল্ড ইনইক্যুয়ালিটি রিপোর্টেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে যে আয় তালিকার একদম উপরের সারিতে থাকা দশ শতাংশ লোকের হাতে দেশের প্রায় সাতান্ন শতাংশ অর্থ রয়েছে। আমাদের দেশে অতি বড়লোকের সংখ্যাও বেড়েছে কোভিড কালে। তার মানে যাদের হাতে অর্থ ছিল, তারা আরও অর্থ উপার্জন করেছে। অপর দিকে সমাজের গরিব, শ্রমজীবী শ্রেণি নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়েছে। এমনকী অনেকে এও দাবি করেছে যে আমাদের দেশের ধনীতম ১১ জন ব্যক্তির আয় গত দু'বছরে যতটা বেড়েছে, তা দিয়ে নাকি আগামী দশ বছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রক ও সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার যাবতীয় খরচের বন্দোবস্ত করা সম্ভব। অসাম্যের আরও একটি ভয়াবহ চিত্র ধরা পরে শিক্ষাক্ষেত্রে। গত দু'বছর কোভিডের আতঙ্কে শিক্ষা প্রায় পুরোটাই অনলাইনে চলে গিয়েছিল। কয়েক বছরে আগেও এ সব ছিল কল্পনার অতীত। এতে নিশ্চিত ভাবে শিক্ষার মান বেশ কমেছে, সঙ্গে কমেছে শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক খরচ। সেটাই আশঙ্কার কারণ। খরচ কমিয়ে ফেলতে পারলে সরকারি ও বেসরকারি, উভয়েরই আনন্দ অপরিসীম। শিক্ষার মান নিয়ে ভাবনা তাদের কাছে বিলাসিতা। তাই ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষার উৎকর্ষ নিয়ে সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে। এ ছাড়াও অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় কিন্তু শিক্ষাকে সবার নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব নয়। আমাদের দেশের অত্যন্ত গরিব ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশের কাছে ইন্টারনেট এবং কেবলমাত্র ৩ শতাংশের আয়ত্তের মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার। তা হলে, বাকিদের কি শিক্ষার অধিকার নেই? ক্রমান্বয়ে এই অসামঞ্জস্য যে আরও বাড়বে তা সন্দেহাতীত - বর্তমানে শিক্ষা নাগালের বাইরে থাকার ফলে ভবিষ্যতে প্রকট হবে আয় বৈষম্য এবং আরও বাড়বে শিক্ষা বৈষম্য। কারণ, ভুললে চলবে না যে আমাদের দেশে শিক্ষা আজকাল অনেকাংশে গৃহশিক্ষক নির্ভর। কিন্তু তিনিও তো আর বিনা বেতনে পড়াবেন না। সুতরাং, গরিবের আয় কমলে, বাড়বে স্কুলছুটের সংখ্যা, বাড়বে শিশু শ্রমিক এবং স্কুলে অনুপস্থিতি ইত্যাদি। ক্রমশ শিক্ষায় বৈষম্যের কুপ্রভাব হয়ে উঠবে সুদূরপ্রসারী, ছড়িয়ে পড়বে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে। অতি সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু একটি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে বলে 'স্ট্যাগফ্লেশন' - 'স্ট্যাগনেশন' এবং 'ইনফ্লেশন'-এর মিশ্রণ। এ এমন এক আর্থিক পরিস্থিতি যেখানে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক বিকাশ একটি নির্দিষ্ট স্তরে থিতু হয়ে থাকে; সেই সঙ্গে থাকে নাছোড়বান্দা মুদ্রাস্ফীতি। মুদ্রাস্ফীতি সাধারণত দু'দিক থেকে আসতে পারে। এক, বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা থাকলে দামবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। অতিরিক্ত চাহিদা, চাহিদা বৃদ্ধির কারণেও হতে পারে; আবার, জোগানের ঘাটতির কারণেও দেখা দিতে পারে। এই করোনাকালে দ্রব্য বা পরিষেবার অতিরিক্ত চাহিদা অবিশ্বাস্য। তা হলে পড়ে থাকল কম জোগানের কারণে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা। এ ছাড়াও আরও একটি সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণেও দাম বাড়তে পারে। একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যায় যে, এ ক্ষেত্রেও উপাদানের বাজারে জোগানের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং পর্যায়ক্রমে চূড়ান্ত দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। অর্থাৎ, মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে জোগান কমের কারণে। এবং জোগান কম হচ্ছে কারণ উৎপাদন কম। কম উৎপাদন ও বেকারত্ব যে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, সে আর বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। ফলত জোগান বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থান ও মুদ্রাস্ফীতির সমস্যা কিছুটা মেটার সুযোগ রয়েছে। যুগপৎ, এই দুই সমস্যা মেটানোর আশু রাস্তা হল বিনিয়োগকারী ও উৎপাদককে প্রণোদনা দেওয়া। এখন দেখার অর্থমন্ত্রী তাঁর ঝুলি থেকে কোনও ম্যাজিক সমাধান বের করতে পারেন কিনা। এবার আসি একটি বহুল চর্চিত এবং বিতর্কিত বিষয়ে - অর্থনৈতিক অসাম্য ও স্বাস্থ্য-অসাম্য। সমাজবিজ্ঞানীদের একটা বড়ো অংশ সহমত যে আয়ের অসম বণ্টন স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অসাম্য সৃষ্টি করে। তাঁদের যুক্তি খানিকটা এ রকম। অসুস্থ অবস্থা থেকে নিস্তার পেতে হলে স্বাস্থ্য পরিষেবার সাহায্য নিতেই হবে। সমস্যাটা সেখানেই। তুলনায় অবস্থাপন্ন মানুষ অতি সহজেই চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা করে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। অন্য দিকে তুলনায় দরিদ্র মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য অর্থসংস্থান করা সহজসাধ্য হয় না। ফলে, দরকারি পরিষেবা থেকে তারা বঞ্চিত থেকে যায়। চিকিৎসা হয় বিলম্বিত হয় বা রয়ে যায় অধরা। অসুস্থ গরিব মানুষের আয় কমে অস্বাভাবিক মাত্রায়। এবং স্বাভাবিক ভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে বৈষম্য আরও প্রকট হয়। সরকারি ও বেসরকারি, উভয় ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা বাজার-মূল্যে বিকোয় বলে সঠিক গুণসম্পন্ন পরিষেবা অনেক সময় নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরেই থেকে যায়। আবার সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা আয়ত্তাধীন করার সমস্যা তো আরও প্রবল। ধনীরাই সমাজে প্রভাবশালী এবং প্রভাবশালী অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। গরিবরা সেখানেও ব্রাত্য। অর্থাৎ, সরকারি হাসপাতালের নিখরচায় পরিষেবাও তাদের করায়ত্ত যারা অর্থ, প্রভাব, প্রতিপত্তির জোরে তার নাগাল পেতে পারে। পরিশেষে, অসাম্যের আলোচনায় একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন না করলে অন্যায় হবে। এই করোনা মহামারির সময়ে আমরা বিশ্বজোড়া বণ্টনের অসাম্য লক্ষ্য করছি। এ অসাম্য শুধু আয়ের নয়, সম্পদের নয়। এই অসাম্য ওষুধের, অক্সিজেনের, করোনার প্রতিষেধক টিকার। তুলনায় নিম্ন আয়ের দেশগুলি পর্যাপ্ত টিকার জোগান থেকে বঞ্চিত। কিন্তু তার ফল কি ভালো হচ্ছে? করোনাভাইরাস নতুন কোনও রূপে টিকাহীন মানুষের ওপর প্রথমে হামলা চালাচ্ছে। তার পর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন দেশে। সেখানে ধনী-গরিব বাছবিচারের শিক্ষা ভাইরাসের নেই। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে উন্নত-অনুন্নত বিভিন্ন দেশে ওমিক্রনের প্রাদুর্ভাব দেখলে এ কথা সহজেই বোঝা যায়। আজকের পৃথিবী আন্তর্জাতিক উড়ান, শ্রমের চলাচল, দ্রব্যের আদান-প্রদান বন্ধ করে চলতে পারে না। কারণ, তা হলে তো রবীন্দ্র-পংক্তি একটু পরিবর্তন করে বলা যায়, 'দ্বার বন্ধ করে দিয়ে করোনারে রুখি/ 'উন্নয়ন' বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?'। তাই বৈষম্য, তা সে যে কোনও আকারে বা বিন্যাসেই থাকুক না কেন, তাকে কমাতে পারলে মানুষ প্রজাতির অমঙ্গল অবশ্যম্ভাবী। কারণ, 'পশ্চাতে রেখেছ যারে / সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে'।


from Bengali News, Bangla News, বাংলা সংবাদ, বাংলা নিউজ, News in Bengali, কলকাতা বাংলা খবর - Ei Samay https://ift.tt/CV3bsHoDQ
Previous article
Next article

Leave Comments

Post a Comment

ads

Articles Ads 1

ads

Advertisement Ads